রেনুর পুকুর প্রস্তুতিঃ

 রেনুর পুকুর প্রস্তত

অনেক চাষি ভাইয়ের অনুরোধে রেনুর পুকুর প্রস্ততের পোস্ট পুনরায় করা হলো।
আগের পোস্ট গুলোর হেডলাইনের সমস্যা এবং সবগুলো এলোমেলো ভাবে করায় চাষি ভাইয়েরা খোঁজে পাচ্ছেন না।

ক্যাটফিস (শিং-মাগুর,পাবদা-গুলসা-টেংরা, কৈ)
(১) পুকুর নির্বাচন :- বন্যামুক্ত, দৈনিক ৮ ঘন্টা সূর্যের আলো পড়ে, পুকুরে পাতা পড়ে এমন গাছপালা নেই, পানির গভীরতা উঠা নামা করা যায়, আয়রন মুক্ত পানির সেচ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, ১০ থেকে ৪০ শতকের মধ্যে এমন পুকুর নির্বাচন করুন।
বড় পুকুর রেনুর জন্য আদর্শ নয়।
রেনুর পুকুর ধানের জমির পাশে হলে ঘন ঘন হাঁস পোকা সহ বিভিন্ন ধরনের পোকা আক্রমণ করবে।
তাই পুকুর নির্বাচনের সময় বিষয় টা মাথায় রাখবেন।
(২) পুকুর প্রস্তত :- অবশ্যই রেনুর পুকুর শুকিয়ে নিতে হবে।
তারপর কিছু কাঁদা মাটি তুলে পুকুর পাড়ের ভাঙা অংশ মেরামত ও গর্ত গুলো বন্ধ করে নিবেন।
পানিতে পাতা পড়ে এমন গাছের ডালপালা ছাটাই করে দিবেন।
তারপর পুকুর পাড়ের চারপাশে ভালো করে নেটিং করে নিবেন। অবশ্যই ৬" করে মাটি খুঁড়ে নেটের নীচের অংশ টা পুঁতে দিবেন।
এ কাজটা পানি প্রবেশ করানোর আগে করতে হবে, তাহলে ব্যঙ আর বাচ্চা ফোঁটাতে পারবেনা।
তারপর শতকে ৫০০ গ্রাম চুন হালকা গরম থাকা অবস্থায় সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিবেন।
যদি কোন চাষি মনে করেন, তাহার পুকুরের মাটিতে জীবাণু রয়েছে?
তাহলে চুন দেওয়ার আগের দিন শতকে ১০০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার পরিমাণ মতো পানির সাথে মিশিয়ে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিবেন।
চুন দেওয়ার ৩ দিন পর পানি প্রবেশ করাবেন।
পানি প্রবেশের পরদিন অবস্থা বুঝে আরো ৩০০/৫০০ গ্রাম চুন দিয়ে দিবেন।
চুন দেওয়ার ৩/৫ দিন পর শতকে ২৫০ গ্রাম আটা/ময়দা, ৫০ গ্রাম চিটাগুড়, ১০ গ্রাম ঈষ্ট পরিমাণ মতো কুসুম কুসুম গরম পানির সাথে মিশিয়ে ৭২ ঘন্টা ফার্মেন্টেশন করে রোদ থাকা অবস্থায় সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিবেন।
যারা পুকুরের মাটি কাটবেন না, তাঁরা এই ফর্মূলা ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করবেন।
রেনুর দেওয়ার ৪৮ ঘন্টা পূর্বে শতকে ২ গ্রাম গ্যাসোনিল পরিমাণ মতো হালকা ভেজা বালুর সাথে মিশিয়ে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিয়ে কয়েক বার হররা টেনে দিবেন।
রেনু ছাড়ার ২৪ ঘন্টা পূর্বে শতকে ৫ মিলি করে সুমিথিয়ন দিয়ে দিবেন।

কার্পমাছ ও পাঙাশ মাছের রেনুর পুকুর প্রস্তত পদ্ধতি প্রায় একই ধরনের।
শুধু বাড়তি কিছু কাজ করতে হবে।
তা হলো পানি প্রবেশের দ্বিতীয় কিস্তি চুন দেওয়ার ৩/৫ দিন পর উল্লেখিত আটার ফর্মূলা টা বাদ দিয়ে শতকে ২৫০ গ্রাম সরিষার খৈলের সাথে পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে ৪৮ ঘন্টা রেখে দিবেন।
তারপর এর সাথে ৫০/৭০ গ্রাম টিএসপি সার মিশিয়ে আরো ২৪ ঘন্টা রেখে দিবেন।
মোট ৭২ ঘন্টা পরে এর সাথে ১০০/১৫০ গ্রাম ইউরিয়া সার মিশিয়ে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিবেন।
তবে এই ফর্মূলটা প্রয়োগে আপনার পুকুরে কোন সমস্যা তৈরী করবে কিনা এটা আগে জেনে নিবেন।
এটা দেওয়ার ২৪/৪৮ ঘন্টা পর পূর্বের নিয়মে গ্যাসোনিল দিয়ে বাকী কাজ গুলো করবেন।
মনে রাখবেন রেনুর পুকুর প্রস্ততির কাজ গুলো পর্যায়ক্রমে করতে হবে এবং তা হাতে সময় নিয়ে করতে হবে।
দুঃখের বিষয় অনেক চাষি ভাইকে দেখি রেনু ছাড়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি করে পুকুর প্রস্ততিটা ঠিক মতো সম্পন্ন করতে পারেন না!!
সবচেয়ে ভালো হয় রেনু ছাড়ার ২৪ ঘন্টা পূর্বে পানির পিএইস, এ্যামোনিয়া চেক করে নিতে পারলে।
তারপর সকাল অথবা সন্ধ্যায় রেনু অবমুক্ত করবেন।
রেনু কিভাবে অবমুক্ত করবেন এবং কিভাবে পরিচর্যা নিবেন, এ বিষয়ে ইতিমধ্যে পোস্ট করেছি।

বিঃদ্রঃ কপি করা নিষেধ।



যে সকল নতুন চাষি রেনু চাষ করতে চাচ্ছেন তাঁরা লক্ষ্য করুন,,, 

পোনা মাছ আর রেনু চাষের মধ্যে অনেক তফাৎ রয়েছে।
মাছ চাষে পরিপূর্ণ অভিজ্ঞ না হয়ে অনেক নতুন চাষি যে কোন একটা পুকুরে রেনু ছেড়ে দিয়ে বসেন!!!
অনেক অসাধু পোনা বিক্রেতা নিজের লাভের কথা চিন্তা করে চাষিদের ভুল বাল বুঝিয়ে রেনু চাষে উদ্ধুদ্ধ করেন!! 
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আসলেই কি যে কেউ চাইলে রেনু চাষ করতে পারবেন??

একটি মানব শিশু জন্ম নেয়ার পর প্রথম ৪০ দিন মায়ের বুকে নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে লালন-পালন করতে হয়।
শিশুটিকে যে ঘরে লালন করা হয় ঐ ঘরকে আঁতুড় ঘর বলা হয়।
ঘরের পরিবেশ এমন ভাবে সাজানো হয় যেন নবজাত শিশুর কোন সমস্যা না হয়।
তদ্রুপ মাছের রেনুর ক্ষেত্রেও যে পুকুরে রেনু চাষ করা হয় সে পুকুর কে আঁতুড় পুকুর বলা হয়।
এই পুকুরের পরিবেশও এমন ভাবে সাজাতে হবে যেন রেনুর কোন সমস্যা না হয়। 
আসুন রেনুর পুকুরের পরিবেশ কেমন হওয়া চাই জেনে নিই :-
১/ পানির পিএইস ৭ থেকে ৮.৫ এ-র মধ্যে রাখতে হবে।
২/ অক্সিজেনের পরিমাণ ৫/৭
৩/ এ্যামোনিয়া, এ্যামোনিয়াম, নাইট্রেট, হাইড্রোজেন সালফাইড ০.০
৪/ পানির গভীরতা ৩ ফুট, যা প্রতি দিন অল্প অল্প করে বাড়াতে হবে। 
৫/ পানির তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ২৫° সর্বোচ্চ ৩০° ডিগ্রি সেলসিয়াস।
৬/ আয়রন ও এ্যামোনিয়া মুক্ত গভীর নলকূপের সেচ দেয়ার ব্যবস্হা থাকতে হবে।
৭/ পুকুরের চারপাশে এবং উপরে নেটিং করতে হবে।
৮/ পুকুরে কোন ধরনের আগাছা, লতাপাতা ও ঘাস থাকতে পারবেনা।
৯/ পুকুরে গাছের পাতা পড়তে পারবেনা।
১০/ অতিরিক্ত গরমে কলাপাতা, তালপাতা অথবা বড় পানা দিয়ে পুকুরের কিছু অংশে রেনুর জন্য অস্থায়ী ভাবে অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে।
১১/ সঠিক গাইডলাইন অনুসরণ করে রেনুর পুকুর প্রস্তত করতে হবে।
১২/ রেনুর অন্ত্রনালী খুবই সূক্ষ্ণ হয়ে থাকে, তাই শুরুতে সরিষার খৈল খাওয়ানো যাবেনা। 
প্রথম তিন দিন সিদ্ধ ডিম আর ময়দা, তারপর থেকে রেনুর নার্সারী পাউডার খাওয়াতে হবে।
ইত্যাদি গাইডলাইন যে চাষি অনুসরণ করে রেনু চাষ করবেন, ইনশাআল্লাহ তাঁর উৎপাদিত পোনার মান অবশ্যই ভালো হবে।
এবার নিজেকে নিজে প্রশ্ন করুন, কয়জনে এই কাজগুলো অনুসরণ করেন??



‘‘আমরা বন্ধু আমার ঠিকানা - আমাদের কথা আমাদের প্রযুক্তি, আমার বর্ণমালা’’

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post